নরেন্দ্রনাথ কুলে
কাশ্মীর আবারো রক্তাক্ত। কাশ্মীরে যে শান্তি ফেরেনি তার নিদর্শন গত ২২.০৪.২৫ র ঘটনা। জঙ্গীরা পর্যটকের ওপর হামলা চালালো। মৃত্যমিছিলে কাশ্মীরের রূপ ঢেকে গেল বারুদের ঝলকানিতে। নিন্দার ভাষা নেই। দেশের মানুষ শোকস্তব্ধ। কাশ্মীরে শান্তি ফেরানোর নামে কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকার ২০১৯ সালের ৫ আগস্ট ৩৭০ ধারা বিলোপের মধ্য দিয়ে যে কাজ শুরু করেছিল তার ফলস্বরূপ শান্তি বার্তার কথা ছাড়া এখনো প্রকটভাবে তা প্রমাণিত হল না। ৩৭০ ধারা ছিল বলে উন্নয়ন যেমন হয়নি কাশ্মীরে, তেমন জঙ্গী কার্যকলাপের বাড়বাড়ন্ত ছিল বলে দাবি করা হয়েছিল। এখন যে হামলা হল তা ৩৭০ ধারা বিলীনের ফলে কাশ্মীরবাসীর জীবন এত সুন্দর ও শান্তিময় হয়ে উঠেছে তাতে নাকি সন্ত্রাসের কাজে জঙ্গি সংগঠন নাকি লোক পাচ্ছে না। তাই এই হামলা। একটা শ্রেণী হামলার পরপরই এমন মন্তব্যে সামাজিক দেয়াল ভরিয়ে দিয়েছে। যাই হোক না কেন যুক্তি দিতেই হবে। তর্কে জিততে হবে। এমন মনোভাব ভেসে চলেছে সমাজ মাধ্যমে। অথচ সমাজ মাধ্যমে হতদরিদ্র ঘোড়াওয়ালার ছবিও দেখা গেছে বা যাচ্ছে যা কাশ্মীরবাসীর স্বাচ্ছন্দ্য জীবনের ছবি নয়।
সমাজ মাধ্যমে আর একটি জিনিস ভেসে চলেছে। পহেলগাঁও-এ জঙ্গীরা পর্যটকদের মধ্য থেকে হিন্দু বেছে বেছে খুন করেছে। তার প্রমাণ হিসেবে হতভাগ্য পরিবারের মানুষের কথার শব্দ প্রচারিত হচ্ছে। প্রথমশ্রেণীর কিছু সংবাদমাধ্যমে এই বেছে বেছে হিন্দু পর্যটকের খুন হয়েছে বলেও প্রচার হয়েছে। পর্যটক খুনের খবর যখন প্রথম সমাজমাধ্যমে আসে তখন এই বেছে বেছে জঙ্গীরা খুন করেছে তা কিন্তু খবর ছিল না। তাই এই প্রচার নিয়ে অনেক প্রশ্ন উঠে আসে।
প্রথমেই যে কথাটা বলতে হয়, জঙ্গীরা এলো খুন করলো তাও বেছে বেছে তারপর তারা শান্তভাবে চলে গেল। কাশ্মীরে প্রতি দশজনে একজন নিরাপত্তাকর্মী নিযুক্ত করা আছে যখন, তখন জঙ্গীরা এত সুষ্ঠুভাবে খুন করতে পারলো কি করে? হিন্দু বেছে বেছে ২৬ জন পর্যটককে খুন করতে সময় লাগার কথা। এত সময় নিয়ে খুন করলো আর নিরাপত্তা বাহিনী টেরই পেল না তা কি করে হতে পারে? যদিও নিরাপত্তার গাফিলতির কথা নাকবেড় কানবেড় দিয়ে স্বীকার করেছে প্রশাসন। কাশ্মীর একটি তীব্র সংবেদনশীল অঞ্চল সেখানে নিরাপত্তার গাফিলতি হল? যেখানে পর্যটন মরশুম শুরু হয়ে গেছে সেখানে নিরাপত্তা গাফিলতি করারই বা অর্থ কি?
নিরাপত্তা বাহিনীর চোখ এড়িয়ে জঙ্গী ঢুকে পড়লো, পর্যটকদের খুন করলো। তারপর বাহিনীর তৎপরতা দেখে অবাক হতে হয়। জঙ্গী খুঁজে পাওয়া এখনও যায়নি। কিন্তু তাদের চিহ্নিত এক নিমেষে করা গেল। জঙ্গি-সহযোগীদের চিহ্নিত করতে এতটুকু সময় লাগলো না। শনিবার (২৬.০৪.২৫) পর্যন্ত সন্দেহভাজন আটজন জঙ্গির বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। পর্যটক খুনের পর এই জঙ্গিদের খবর নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে চলে এলো, অথচ হামলার আগে তা ছিল না কেন? আবার এখন ইন্টেলিজেন্সের কাছে খবর আছে বলে খবর প্রকাশিত হল যে প্রায় একশো পঁচিশ জন জঙ্গির অনুপ্রবেশ ঘটেছে বলে তাদের অনুমান। কি দারুণ ইন্টেলিজেন্স, ঘটনা ঘটার পর কত খবর কত সহজে তাঁরা জোগাড় করতে সক্ষম হচ্ছে।
জঙ্গী ধর্ম দেখে খুন করেছে বলে এই ঘটনা ভারতের বুকে হিন্দুদের মধ্যে মুসলমান বিদ্বেষ আরো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কিন্তু জঙ্গীর ধর্ম হয় না বলে যতই যুক্তি থাকুক না কেন, শুধু নামের বহরে তাদের ধর্মের সব মানুষকেই জঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করা অত্যন্ত বিপজ্জনক। অথচ কাশ্মীরবাসী মুসলমান যে ঘোড়াওয়ালা পর্যটককে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হল তাঁর মহত্ব প্রচারহীন হয়ে থাকে। প্রচারহীন হয়ে থাকে তাঁদের খবর যাঁরা আটকে পড়া পর্যটকদের বিনা পয়সায় রেল স্টেশন ও বিমান বন্দরে ছেড়ে দেয়। তাঁরাও ধর্মে মুসলমান। জঙ্গীর নাম অনুযায়ী মুসলমান যারা পর্যটক খুন করে, আর যে মুসলমান পর্যটকদের আশ্রয় দেয় এবং সাহারা দেয়, দুই মুসলমান যদি একই বন্ধনীতে বসানোর প্রয়াস চলে তাহলে সেই যুক্তি যে একটা উদ্দেশ্যে তৈরি করা তা কি বোঝা যায়? কাশ্মীরবাসী মুসলিম মানেই সন্ত্রাসী, যাঁরা পর্যটক তাঁরা কখনোই তা বলতে পারে না। জঙ্গি হামলায় সে প্রমাণ কাশ্মীরবাসীরা দিয়েছে। সে কথা ভুলিয়ে দিলে চলে না।
কাশ্মীরে এই জঙ্গি হামলা নিয়ে ভারত সরকার কোনোভাবেই সহ্য করবে না বলে তার নিদর্শন দিয়েই চলেছে। পাকিস্তানের সাথে যুদ্ধং দেহী পরিস্থিতি তৈরি করে ফেলেছে। পাকিস্তানের থেকে সামরিক সজ্জায় ভারত কত শক্তিশালী পরিসংখ্যান দিয়ে খবরের পর খবর প্রচারিত হচ্ছে। বিভিন্ন সামরিক বাহিনী কিভাবে তৈরি হয়ে আছে তার নিদর্শন চলছে। যুদ্ধের মহড়ায় জঙ্গীঘাঁটি ধ্বংস করলো। পাকিস্থানের প্রতি বিদ্বেষে ভারতের এই সামরিক অবস্থান দেশের মানুষের কাছে আস্থা তৈরি করা সহজ হতে পারে। পাকিস্তান দেশকে যুদ্ধ যুদ্ধ ভয় দেখিয়ে, কিংবা যুদ্ধ করে জঙ্গী নির্মূল করা সম্ভব কি? বিদ্বেষ থাকলে এ প্রশ্নের হয়তো কোন প্রয়োজন নেই। রাষ্ট্রের প্রতি রাষ্ট্রের বিদ্বেষ থেকেই তো জঙ্গী মোকাবিলা করার জন্য প্রথম থেকেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত যাতে নিজের দেশে জঙ্গীর অনুপ্রবেশ কোনভাবেই না ঘটে। কিন্তু সেই কঠোর ব্যবস্থার পরিচয় দিতে পারেনি এই প্রশাসন। ২০১৪ থেকে এ পর্যন্ত মোট সাতাশটি জঙ্গি হামলা হয়েছে কাশ্মীরে। সবথেকে বড় হামলা ২০১৯ সালের পুলওয়ামা হামলা। চল্লিশজন সেনা নিহত হন। 'হাই সিকিউরিটি জোন' এ হামলা চালিয়েছে তারা। তার ব্যাখ্যা প্রশাসন এখনো দিতে পারেনি। পুলওয়ামার পর পহেলগাঁও-এর হামলা আরো একটা বড় হামলা হল। তার ব্যাখ্যার প্রয়োজনে অলরেডি হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ তত্ত্ব হাজির করা গেছে। এই তত্ত্বের প্রয়োজন ভোটের প্রয়োজনে হতে পারে, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে হতে পারে। কিন্তু সাধারণ মানুষ যাঁরা যে কোন বিপর্যয়ে অসহায় হয়ে পড়ে তাঁদের কোনভাবেই তা প্রয়োজন নেই। করোনাকালে যে আশি কোটি অসহায় সাধারণ মানুষ (তা কি কেবল হিন্দু ধর্মের মানুষ?) বিনা পয়সায় রেশন পেয়েছে তাঁদেরও প্রয়োজন নেই।
ভারতের প্রতি বিদ্বেষে পাকিস্তানের জঙ্গী এলোপাথাড়ি গুলি চালিয়ে হামলা করবে এটাই স্বাভাবিক। অথচ তারা তা করলো না। তাই এই প্রশ্ন আবারো আসে যে এই হামলা কিসের প্রয়োজনে কাদের প্রয়োজনে হলো? পুলওয়ামার মতোই এর উত্তর সাধারণ মানুষ পাবে না।

