পাঠক মিত্র
বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমেছে। গত চার বছরে এটা সর্বনিম্ন। কিন্তু এর ফলে এ দেশের মানুষ কি সুরাহা পাবে? বিশেষজ্ঞরা বলছেন বিশ্ব বাজারে তেলের মূল্যহ্রাসে ভারতের সুবিধা হবে। কিন্তু এই মূহুর্তে এ দেশে তেলের দাম কমবে না। অর্থাত মানুষের সুরাহা হবে না। কিন্তু ভারতের সুবিধা হবে। এ এক আশ্চর্য কথা, মানুষের সুবিধা না হলেও দেশের সুবিধা হবে। দেশের সুবিধায় মানুষ যদি সুবিধা না পায়, তাহলে মানুষ ছাড়া দেশের সুবিধায় কাদের সুবিধা হয়। তার মানে মানুষের জন্য দেশ নয়, কিন্তু দেশের জন্য মানুষ। দেশের জন্য মানুষ অভুক্ত থাকবে, দেশের জন্য মানুষ কর্মহীন থাকবে, দেশের জন্য মানুষ চিকিৎসা ও শিক্ষা না পেলেও কিছু যায় আসে না। দেশের জন্য ত্যাগ করার মহত্বে শুধু গর্বিত হবে মানুষ। আর দেশের সুবিধা নেবে আর এক শ্রেণী। তুমি তো কেবল মানুষ। দেশ এগিয়ে যাবে তুমি এগিয়ে যাবে না। তেলের দাম কমলে তুমি কমা-দামে তা পাবে না, কিন্তু দাম বাড়লে তোমাকে তার মাশুল দিতে হবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে--সম্প্রতি চীনে আর্থিক মন্দা চলছে, মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকা যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি করার পথে এগিয়ে চলেছে এবং ট্রাম্পের শুল্কনীতির পাশাপাশি তেলের উৎপাদনকারী দেশের সংস্থা 'ওপেক' তেল উৎপাদন ও সরবরাহ বৃদ্ধি করার ফলে তেলের দাম কমেছে। এর ফলস্বরূপ ভারতেও তেলের দাম কমেছে, কিন্তু এই মূহুর্তে এ দেশে বাজারজাত তেলের দাম কমবে না। আগামীদিনে বিশ্ব রাজনৈতিক পরিস্থিতির জটিলতায় তেল সরবরাহ ব্যহত হতে পারে। ফলে বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়তে পারে। তখন তেলের দাম বাড়াতে হতে পার। এই পরিস্থিতির কথা ভেবেই নাকি এ দেশে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন এবং এ দেশের তেলের সংস্থাও মনে করছে। বিশেষজ্ঞরা, সরকার পক্ষ দেশের কথা ভেবে, ভবিষ্যতের কথা ভেবে তেলের দাম কমা-বাড়া কিংবা স্থিতিশীল নিয়ে চিন্তিত হবেন, কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের মানুষের সুরাহা নিয়ে ভাববে কে? এ দেশে তেলের দাম বাড়লে, বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বেড়েছে বলে সহজেই যুক্তি দিয়ে তার বিশ্লেষণ চলে। কিন্তু বিশ্ব বাজারে তেলের দাম কমলে এ দেশে তেলের দাম স্থিতিশীল থাকবে আগামী দিনের কথা ভেবে। আসলে এখন তেলের দাম কমিয়ে দিলে, পরবর্তী সময়ে বৃদ্ধির প্রয়োজন হলে তার হার যথেষ্টভাবে বৃদ্ধি করা দৃষ্টিকটু হবে। তাই এই সিদ্ধান্ত। কিন্তু এই সময়ে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখা কাদের সুবিধার জন্য। সাধারণ মানুষের সুবিধার জন্য নয় তা পরিষ্কার।
এই পরিস্থিতিতে তেলের দাম স্থিতিশীল রাখলেও পারিবারিক ব্যবহার্য গ্যাসের দাম পঞ্চাশ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বিশ্ব বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমলেও রান্নার গ্যাসের দাম বেড়ে গেল। অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াকরণের মধ্য দিয়ে শোধিত তেল আর রান্নার গ্যাস তৈরি হয়। এই গ্যাসের অধিকাংশ চাহিদা এভাবেই মিটে যায়। তাহলে এই মূহুর্তে দাম বাড়ার কোন কারণ নেই। তবু দাম বাড়লো। এই দাম বাড়ানো কার স্বার্থে? সেখানে মানুষের কোন স্বার্থ নেই তা আবারো পরিষ্কার।
তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সাথে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্য বৃদ্ধির যোগসূত্র আছে। এই যোগসূত্র বিচার করে বলা যায় তেলের দাম কমলে বাজারদরে তার সুপ্রভাব পড়তো। তাতে মানুষের কেনাকাটায় কিছুটা স্বস্তি হতে পারতো। কিন্তু মানুষ সেই সুবিধা থেকে এখন বঞ্চিত হল। বাজার মূল্যে মানুষ যেটুকু সুবিধা পেতে পারতো তা না পেলে তাতে সুবিধা কে পেল? আসলে মানুষের কথা বললে মানুষের সুবিধার কথা বললে মানুষ শুনতে পায় ঠিকই, কিন্তু মানুষ সুবিধা না পেলে মানুষকেই ভুগতে হয়। আর মানুষ যেভাবেই ভুগুগ না কেন তার দায় সরকার নিয়েছে এমন কোন উদাহরণ নেই। নানা কারণ দেখিয়ে যুক্তি দেখিয়ে সরকার তাঁর দায় এড়িয়ে যায়। তেলের দাম কমলেও আসলে দাম কমলো না, তার জন্য যে কাজটা মানুষের জন্য করা উচিত তা কিন্তু এই মূহুর্তে সরকার করতে অক্ষম বা ব্যর্থ তা নয়। সরকার ইচ্ছাকৃত ভাবে এড়িয়ে যাচ্ছে। এমনিতেই কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারের আলাদাভাবে সেস ও কর প্রয়োগেই তেলের দাম প্রয়োজনাতীত বর্ধিত। এই বর্ধিত মূল্য কম করার কথা কোন সরকারই সচেষ্ট হয় না। কিন্তু বিশ্ব বাজারে তেলের দাম বাড়লে কিংবা কমলে এ দেশে সাথে সাথে তা বৃদ্ধি করার বা স্থিতিশীল রাখার সিদ্ধান্ত নিতে এতটুকু সময় নষ্ট করতে পারেন না। তাহলে মানুষের সুবিধার কথা বলা কেবল বলতে হয় বলেই হয়তো বলতে হয়। তবে সরকার গর্ব করে বলতে বলবে, 'এ তোমার দেশ এ দেশের সুবিধা দেখাই তোমার কর্তব্য। তোমার অসুবিধা হতে পারে, সে অসুবিধা দেশের জন্য তোমাকে সহ্য করতে হবে।' কিন্তু দেশসেবক বলে যাঁরা পরিচিত, যাঁরা মানুষের প্রতিনিধি হয়ে কাজ করার ফিরিস্তি দেয় তাঁরা দেশের জন্য কোন অসুবিধা ত্যাগ করতে পারেন না। তাই দেশসেবক হিসেবে তাঁরা যা বেতন পান তাতে তাঁরা খুশি হতে পারেন না। সেই বেতন কয়েক শতাংশ বৃদ্ধি করতে হয়। মানুষের সুবিধার থেকে তাঁদের কাছে দেশের সুবিধা সত্যই অগ্রাধিকার পায়। তবেই তো দেশসেবক! তেলের দামে দেশের সুবিধা দেখাই তো তাঁদের কাজ। তেলের দাম কমলে তাঁরা খেয়াল করেন না, কিন্তু বাড়লে খেয়াল করেন সেই দেশের স্বার্থেই।


