যোগমায়া আচার্য
প্রতি বছরের ১২ আগস্ট পালিত হয় বিশ্ব হাতি দিবস। ২০১২ সালে এই দিনটি চালু হয়েছিল বিশ্বের হাতি সংরক্ষণ ও তাদের অস্তিত্ব রক্ষার সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে। হাতি শুধু পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্থলচর প্রাণী নয়, তারা প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় অপরিহার্য। বনভূমির বীজ ছড়ানো, জলাশয়ের পথ তৈরি, এবং জীববৈচিত্র্যের রক্ষায় হাতির ভূমিকা অপরিসীম। কিন্তু মানব লোভ ও অবহেলায় এই মহারথী প্রাণী আজ বিলুপ্তির হুমকির মুখে।
বর্তমানে আফ্রিকা ও এশিয়ার হাতি উভয়ই সংকটাপন্ন। বন উজাড়, কৃষি সম্প্রসারণ, অবৈধ শিকার ও দাঁতের হাতির দাঁতের (আইভরি) ব্যবসা তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমিয়ে দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক পরিবেশ সংস্থা IUCN-এর তথ্যানুসারে, গত কয়েক দশকে হাতির সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস পেয়েছে। শুধু আফ্রিকাতেই প্রতিবছর হাজার হাজার হাতি শিকারির হাতে প্রাণ হারায়, আর এশিয়ায় হাতি হারাচ্ছে তাদের প্রাকৃতিক আবাসভূমি।
হাতি মানুষের সঙ্গে হাজার বছরের সম্পর্ক বহন করে আসছে—শ্রম, পরিবহন, ধর্মীয় অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতিতে তাদের উপস্থিতি গভীর। বিশেষত ভারতীয় উপমহাদেশে হাতি গৌরব, শক্তি ও সৌভাগ্যের প্রতীক। কিন্তু এই শ্রদ্ধা ও ঐতিহ্যের আড়ালেও অনেক সময় তাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা চালানো হয়—যেমন পর্যটনের জন্য শৃঙ্খলাবদ্ধ জীবন, অস্বাস্থ্যকর প্রশিক্ষণ, এবং অমানবিক শ্রমে নিযুক্ত করা।
বিশ্ব হাতি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই মহিমান্বিত প্রাণী কেবল বন্যপ্রাণী নয়, তারা পরিবেশের অঙ্গ। তাদের রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রকৃতির ভারসাম্য সংরক্ষণ করা। সংরক্ষণের জন্য কঠোর আইন প্রয়োগ, শিকার প্রতিরোধে প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় জনগণকে সচেতন করা, এবং হাতির আবাসভূমি পুনর্গঠন—সবই জরুরি পদক্ষেপ। একইসঙ্গে পর্যটন ও বিনোদনের ক্ষেত্রে নৈতিক নীতি গ্রহণও প্রয়োজন, যাতে হাতিদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ নিশ্চিত হয়।
প্রকৃতির এই মহারথীরা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আমাদের গ্রহকে সমৃদ্ধ করেছে। তাদের পদচিহ্ন শুধু মাটিতে নয়, মানব ইতিহাস ও সংস্কৃতিতেও অম্লান। কিন্তু যদি আমরা আজ পদক্ষেপ না নিই, তবে আগামী প্রজন্ম হয়তো শুধুমাত্র ছবিতে হাতি দেখবে। তাই এই বিশ্ব হাতি দিবসে প্রতিজ্ঞা হোক—আমরা হাতিকে কেবল রূপকথায় নয়, বাস্তবের বনে-বনে দেখতে চাই, স্বাধীন, নিরাপদ এবং গর্বিত ভঙ্গিতে চলতে।


