বটুকৃষ্ণ হালদার
১ লা মে শ্রমিক দিবস পালিত হয় কিন্তু বিশ্বের শ্রমিকদের দুঃখ, কষ্ট অনুধাবন করলে বুঝতে পারবেন শ্রমিকরা ভালো নেই, স্বল্প মূল্যের বিনিময়ে খুব সস্তায় শ্রমিকদের শ্রম কেনাবেচা চলছে। ঠিক তেমনি যাঁরা ভারতবর্ষকে নিজেদের মায়ের থেকে বেশি ভালোবেসে ছিলেন, দিনের পর দিন রাত জাগা অনাহার শত কষ্ট লাঞ্ছনা কে উপেক্ষা করে জীবনের বিনিময়ে এই ভারতবর্ষকে স্বাধীনতা দিয়ে গেছে তারাই শ্রমিকদের মতো অবহেলিত। সবাই ইতিহাসের পাতায় স্থান পায়নি। জন্মদিন, মৃত্যু দিবস ভুলে মেরে দিয়েছি।
ব্রিটিশরা প্রায় দুই'শ বছর এই ভারতবর্ষ কে পরাধীন করে রেখেছিল। দিনে দিনে চরম অপমান, লাঞ্ছনা, গঞ্জনা অত্যাচার বেড়েই চলেছিল ভারতবাসীদের উপর। ভারতবাসীদের সঙ্গে কুকুরের তুলনা করা হতো। হতভাগ্য দেশপ্রেমিকরা নিজেদের জীবনের বিনিময়ে দেশবাসীকে স্বাধীনতা দিয়ে গিয়েছিল। তারা কোন যোগ্য সম্মান পেল না। অথচ যারা এই ভারতবর্ষে ব্রিটিশদেরকে জামাই আদর করে ভারতবর্ষকে শোষণ করতে সাহায্য করেছিল, দুই হাত ভরে ব্রিটিশদের উৎকোচ গিলেছিল তারাই দেশের জনক হয়ে উঠলেন। মনে রাখবেন দেশের স্বাধীনতা চরকা কেটে কিংবা অনশন করে আসেনি। এসেছিল স্বাধীনতা প্রেমীদের জীবনের বিনিময়ে রক্তের পিচ্ছিল পথ ধরে।
ফিরে আসবো বাংলা মায়ের দামাল ছেলে প্রফুল্ল চাকীর আত্ম বলিদানের ইতিহাস নিয়ে। ২রা মে ১৯০৮ সালে ঠিক আজকের দিনেই ব্রিটিশের পা চাটা বাঙালি পুলিশ অফিসার নন্দলাল ব্যানার্জীর হাতে ধরা দেবেননা বলে পিস্তল নিজের মাথায় ঠেকিয়ে গুলি করে শহীদ হন ক্ষুদিরামের সহযোগী অগ্নিযুগের বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকী। তাঁর বয়স তখন মাত্র উনিশ বছর। পরে তাঁকে শনাক্ত করার জন্য বর্বর ইংরেজ সরকার প্রফুল্ল চাকীর মাথাটা ধড় থেকে কেটে আলাদা করে একটা টিনের বাক্সে করে নিয়ে আসে, এবং কলকাতার কোন গোপন স্থানে সেটা পুঁতে ফেলে।
প্রফুল্ল চাকীর মৃতদেহ পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হয়নি। প্রফুল্ল চাকীর মা তাঁর ছেলের কাটা মাথার ছবি দেখে বলে ওঠেন এমন ছেলের জন্ম দিয়ে আমার জীবন ধন্য, এবং তিনি নদীর তীরে একটি কুশপুত্তলিকা তৈরি করে সেটি দাহ করেন এবং পরে সুযোগ্য পুত্রের শ্রাদ্ধ ক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
প্রফুল্ল চাকী (ডিসেম্বর ১০, ১৮৮৮ - মে ২, ১৯০৮) ছিলেন ভারতের ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম সর্বকনিষ্ঠ মুক্তিযোদ্ধা ও অগ্নিযুগের বিপ্লবী। তিনি তৎকালীন ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশ নেন এবং জীবন বিসর্জন করেন।
তখন অগ্নিযুগ। ভারতবর্ষের রাজনৈতিক অস্থিরতা চরমে। ভারতমাতার স্নায়ুস্বরূপ বাংলা থেকে সেই বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে শহর থেকে শহরে, গ্রাম থেকে গ্রামাঞ্চলে ভারতমাতার প্রতিটি ধমনীতে। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের জোয়ারে স্বাধীনতা উন্মুখ বীর বঙ্গসন্তানরা তখন গোপনে চিত্রনাট্য রচনা করে সুযোগের জন্য অধীর অপেক্ষা করছেন। সুযোগ এসেও গেল। দুই কিশোরের কান্ড দেখে ইংরেজ সরকার সহ গোটা দেশ তখন হতবাক। দুই কিশোর আত্মবলিদান দিলেন। তবে দ্বিতীয় জনের আত্মবলিদান নিয়ে যতটা মুখর হয়েছে বাঙালি, প্রথম আত্মবলিদানী রয়ে গেছেন আলোচনার অন্তরালে।
ছেলেটার জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের বগুড়াজেলায় বাংলাদেশের বগুড়া জেলার বিহার গ্রামে। পিতার নাম রাজনারায়ণ চাকী, মাতার নাম স্বর্ণময় দেবী। ছোটবেলায় তাঁকে বগুড়ার 'নামুজা জ্ঞানদা প্রসাদ মধ্য বিদ্যালয়ে' ভর্তি করানো হয়। পরবর্তীতে তিনি বগুড়ার মাইনর স্কুলে ভর্তি হন। ১৯০২ সালে রংপুর জিলা স্কুলে ভর্তি হন। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় পূর্ব বঙ্গ সরকারের কারলিসল সার্কুলারের বিরুদ্ধে ছাত্র আন্দোলনে অংশগ্রহণের দায়ে তাঁকে রংপুর জিলা স্কুল হতে বহিস্কার করা হয়। এরপর তিনি রংপুরের কৈলাস রঞ্জন উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। সেখানে পড়ার সময় জীতেন্দ্রনারায়ণ রায়, অবিনাশ চক্রবর্তী, ঈশান চন্দ্র চক্রবর্তী সহ অন্যান্য বিপ্লবীর সাথে তাঁর যোগাযোগ হয় ।
তাঁর জন্ম এক কায়স্থ বংশের স্বচ্ছল পরিবারে। সারা জীবন সুখ-স্বাচ্ছন্দে কাটিয়ে দিতে পারতেন তবুও দেশমাতার প্রতি নিজের কর্তব্য করতে এতটুকু কুন্ঠাবোধ করেননি তাও নিজের জীবনের বিনিময়ে । এখানেই তিনি ঘোড়ায় চড়া, সাঁতার কাটা, কুস্তি, লাঠিখেলায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন।
বঙ্গভঙ্গের বহু পূর্বেই অরবিন্দ ঘোষ বাংলার রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করেন, ফলে আন্দোলনে নব গতি সঞ্চার হয়। কলকাতায় গুপ্ত সমিতির প্রতিষ্ঠা হয় । প্রায় একই সময়ে, প্রমথনাথ মিত্র, সরলা বসু (স্বর্ণকুমারী দেবীর বিদুষী কন্যা) ও যতীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (যাকে অরবিন্দ ঘোষ কলকাতায় প্রেরণ করেছিলেন) নেতৃত্বে ২৪শে মার্চ ১৯০২ খ্রিস্টাব্দে দোল পূর্ণিমার দিনে স্থাপিত হল 'অনুশীলন সমিতি'।
সভাপতি প্রমথনাথ মিত্র চেয়েছিলেন, সামরিক শৃঙ্খলাবদ্ধ, প্রয়োজনার্থে দেশমাতৃকার জন্য আত্মবলিদানোন্মুখ সুস্থ সবলদেহী একদল যুবককে একত্রিত করে সংগঠন তৈরী করতে। কিন্তু দলের অন্যান্য নেতৃৃবৃন্দ চেয়েছিলেন এক সুষ্পষ্ট বৈপ্লবিক কর্মসূচী। বারীন ঘোষ, ভূপেন্দ্রনাথ দত্ত, অবিনাশ ভট্টাচার্য্য প্রমুখ নেতৃৃবৃন্দ প্রত্যক্ষ কর্মকান্ড ও বৈল্পবিক ভাবাদর্শ প্রচারের মাধ্যমে প্রাণবলিদান ও প্রাণহরণের দীক্ষা গ্রহণ করলেন। সকল নেতৃৃবৃন্দের উদ্দেশ্য এক- স্বরাজ লাভ, তবুও যতীন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়ের সাথে বারীন ঘোষের মতভেদ হয় এবং তিনি যুগান্তর নামে নতুন একটি সংগঠন তৈরী করেন। অরবিন্দ ঘোষ বাংলায় আসার পর তাঁর নেতৃত্বে চারটি পত্রিকা প্রকাশিত হতে থাকে। সেগুলি হল - সন্ধ্যা, যুগান্তর, নবশক্তি ও বন্দে মাতরম।
১৯০৫ সালের পর থেকে বাংলার অধিকাংশ পত্রিকা গুলির বিরুদ্ধে ইংরেজ সরকার অভিযান শুরু করে এবং পত্রিকাগুলিকে ক্রমাগত বাজেয়াপ্ত করার চেষ্ঠা করে। যা যুবামানসে এক গভীর প্রভাব বিস্তার করে। এই সময় মেদিনীপুরের এক যুবক হেমচন্দ্র দাসকানুনগো এই অভিনব পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। নিজের বসতভিটে বিক্রয় করে ফ্রান্স যাত্রা করেন বোমা তৈরীর কৌশল শিখবেন বলে। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় প্রত্যাবর্তন করে উল্লাস কর নামে আরেক বোমা বিশারদের সাথে যোগাযোগ করে বোমা তৈরীর কাজে মনোনিবেশ করেন। এদিকে, বারীন ঘোষ তাঁর পৈতৃক নিবাসে দূর দুরান্ত থেকে সব কিশোর-যুবকদের নিয়ে চাঁদের হাট বসিয়ে ফেলেছেন। তাদের মধ্যে বিভূতি সরকার,প্রফুল্ল চাকী, অবিনাশ ভট্টাচার্য্য প্রমুখ।
সংগঠনকে শক্তিশালী করার জন্য সদস্যরা যেমন স্কুল - কলেজের ছাত্রদের মধ্যে প্রচার চালাতে লাগলেন, তেমনি নানাভাবে অস্ত্র সংগ্রহ ও বোমা তৈরীর কাজ চলতে লাগলো। এর পূর্বেই বারীন ঘোষ প্রফুল্ল চাকীকে কলকাতায় নিয়ে আসেন।ইতিমধ্যে কলকাতার তিনটি ঘটনা যুবসুম্প্রদায়কে বিক্ষুব্ধ করে তুলল।
প্রথম ঘটনাটি হল, '' যুগান্তর " সম্পাদক ভূপেন্দ্রনাথ দত্তের জেল ও সাধনা প্রেস বাজেয়াপ্ত করা। দ্বিতীয়টি হল, বিপিন পালের জেল। "বন্দে মাতরম" পত্রিকার সঙ্গে তিনি রয়েছেন, এই ভিত্তিতে বিপিন পালকে আদালতে সাক্ষ্য দান করতে বলা হয়। তিনি নিরপরাধ হওয়ায় সব কিছু অস্বীকার করেন এবং আদলতে অনুপস্থিত থাকেন। ফলে, তাঁকে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁর জেল হয়।
তৃতীয় ঘটনাটি হল, ২৬ শে আগস্ট ১৯০৭ খ্রিস্টাব্দে পথের মধ্যে পুলিশের সাথে বচসা বাঁধে এক পঞ্চদশ বর্ষীয় কিশোর সুশীল সেনের। এই অপরাধে সুশীল সেনকে প্রকাশ্যে পঞ্চদশ বার বেত্রাঘাত করা হয়। যার প্রতিটি আঘাত তৎকালীন যুবামানসকে প্রচণ্ডভাবে রক্তাক্ত করে তোলে। এই সমস্ত ঘটনার পশ্চাতে বিচারক ছিলেন, কোলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট ডগলাস হিউম কিংসফোর্ড।
গুপ্ত সমিতির শীর্ষ স্থানীয় নেতারা স্থির করলেন, এই বিচারক কিংসফোর্ডকে মৃত্যুদন্ড দেওয়া হোক। হেমচন্দ্র কাজ শুরু করলে-ন। একটি ১০৭৫ পৃষ্ঠার একটি গ্রন্থ সংগৃহীত হল। এর মধ্যখানে আয়তকারে কেটে একটি কৌটোতে একটি বোমা রেখে তা ব্রাউন পেপারে মুড়ে একটি গ্রন্থবোমা তৈরী করা হল। এই গ্রন্থবোমা কিংসফোর্ডের গার্ডেনরিচের বাড়ী নিয়ে গেলেন সমিতির এক নতুন সদস্য পরেশ মৌলিক পিয়নের ছদ্মবেশে। কিন্তু ঘটনাচক্রে কিংসফোর্ড কোনদিন গ্রন্থবোমা উন্মোচিত করেননি, তাই সেটা বিস্ফোরনও ঘটায়নি। বর্তমানে এই বোমাটি কলকাতা পুলিশ মিউজিয়ামে সংরক্ষিত রয়েছে। কিন্তু বিস্ফোরনের সংবাদ না পেয়ে সমিতির সকলে খুব হতাশ হলেন। কিংসফোর্ড কলকাতা থেকে বদলি হয়ে মজঃফরপুরে জেলা - জজ হিসেবে যাওয়ার সময় এই গ্রন্থ-বোমাটি সঙ্গে নিয়ে যান, কিন্তু ক্ষুদিরাম কাণ্ডের পূর্বে গ্রন্থ বোমাটি বিস্ফোরিত হয় নি। এটি এখনও সংরক্ষিত আছে কলকাতা পুলিশ মিউজিয়ামে। কিংসফোর্ড সেই যাত্রায় অক্ষত থাকলেন, বিপ্লবীদের প্রথম প্রচেষ্টা অসফল হল।
এই সময় সমিতির শীর্ষস্থানীয় দুই নেতা বারীন ঘোষ ও উল্লাস কর সমিতির কাজকর্ম কলকাতা থেকে দেওঘরে সরিয়ে নিয়ে গেলেন। সেখানে দিঘারিয়া পাহাড়ে বোমার পরীক্ষা করতে আত্মোৎসর্গ করলেন ভারতমাতার চরণে প্রথম আত্মবলিদানী বিপ্লবী প্রফুল্ল চক্রবর্ত্তী। কিন্তু তখনও প্রধান অপরাধী জীবিত। বারীন ঘোষের উপর ভার পড়ল, এই দুঃসাহসিক কার্যে কাকে পাঠানো হবে ! তিনি প্রথম দিকে সুশীল সেনকে নির্বাচন করলেন। সেই প্রহৃত যুবক। বিপ্লবীরা ভাবলেন, যদি সুশীল ধরা পড়ে, এটা সাধারণ প্রতিশোধস্পৃহা বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে। কিন্তু সুশীল সেন সদ্য কিশোর, অনভিজ্ঞ। এই কার্যে তার এক উপযুক্ত সঙ্গী প্রয়োজন। তাঁর এই দুঃসাহসিক কার্যে সঙ্গী হিসেবে নির্বাচিত হন আরেক অগ্নিযুবা, প্রফুল্ল চাকী। এর পূর্বেও তিনি দুয়েকটি বিপ্লবী কার্যের সাথে যুক্ত হয়েছিলেন। তাঁর প্রথম দায়িত্ব ছিল পূর্ব বাংলা ও আসামের নতুন প্রদেশের প্রথম লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার ফুলারকে (১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ -১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দ) হত্যা করা ।
এদিকে, ব্রিটিশ সরকার অনুধাবন করতে পারলো কিংসফোর্ডকে হত্যা করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ১৯০৮ এর মার্চ মাসে কিংসফোর্ডকে জেলা জজ হিসেবে প্রেরণ করা হল মজঃফরপুরে। এপ্রিলমাসে সুশীল সেন ও প্রফুল্ল চাকী মজঃফরপুরে উপস্থিত হলেন ছদ্মনাম নিয়ে যথাক্রমে দুর্গাদাস সেন ও দীনেশ চন্দ্র রায়। তারা উভয়ে কিছুদিনের মধ্যেই কলকাতায় ফিরে আসেন কিংসফোর্ডের খবর নিয়ে এবং এক চরম আঘাত করার প্রস্তুতি নিতে থাকেন। এই মুহূর্তে সুশীল সেন সিলেটে চলে গেলেন তাঁর মুমূর্ষু পিতার সাথে শেষ বারের মত দেখা করতে। বিপ্লবী নেতৃবৃন্দ আর অপেক্ষা করতে না পেরে সুশীল সেনের স্থানে আরেকটি যুবককে অনুসন্ধান করতে লাগলেন । মেদিনীপুরের হেমচন্দ্র তাঁর জেলা থেকে আরেকটি অসীমসাহসী এক সদ্যযুবককে নিয়ে এলেন কলকাতায়। ক্ষুদিরাম বসুও এর পূর্বে বিভিন্ন বিপ্লবী কার্যকলাপে তাঁর দক্ষতা ও সাহসের পরিচয় দিয়েছেন। সুতরাং, শীর্ষস্থানীয় নেতারা তাঁকে সহজেই নির্বাচন করে ফেললেন। প্রফুল্ল চাকীর নাম থাকলো দীনেশচন্দ্র রায় আর ক্ষুদিরাম বসুর নাম হল দুর্গাদাস সেন। সেই রাত্রেই তাঁরা মজঃফরপুরে রওনা দিলেন। অবিনাশ ভট্টাচার্য্য নামে এক ব্যক্তি তাদের পিস্তল ও বোমা দিয়েছিলেন। তাঁরা উঠলেন এক ধর্মশালায়। সেখানকার ম্যানেজার কিশোরীমোহন ব্যানার্জী তখন বিপ্লবীদের আশ্রয় দিতেন এবং গোপনে সহায়তা করতেন। কিন্তু, এতো প্রচেষ্টায় জল ঢেলে দেন স্বয়ং অবিনাশ ভট্টাচার্য্য। তিনি এই পরিকল্পনার কথা জানিয়ে দেন সি. আই. ডি. ইন্সপেক্টর পূর্ণচন্দ্র বিশ্বাসের ঘনিষ্ট বন্ধু রজনী সরকারের কাছে। সেখান থেকে কথাটি পৌঁছে যায় ডেপুটি সুপার রামসদয় মুখোপাধ্যায়ের কানে। তিনি পুলিশ কমিশনার হালিডেকে জানান যে, কলকাতা থেকে দুটি অজ্ঞাত পরিচয় যুবক কিংসফোর্ডকে হত্যা করার জন্য মজঃফরপুরে রওনা হয়ে গেছে। সেই মুহূর্তে এই সমস্ত ঘটনা একটি চিঠিতে লিখে মজঃফরপুরের পুলিশ সুপার আর্মস্ট্রংকে পাঠিয়ে দেন। ব্যাপারটি নিয়ে কিংসফোর্ডের কোন ভ্রুক্ষেপ না থাকলেও ব্রিটিশ পুলিশ তাঁর নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
শুভদিন সমাগত। ১৯০৮ সালে ৩০শে এপ্রিল, বৃহষ্পতিবার। রাত প্রায় আটটা। কাছেই এক ইউরোপিয়ান ক্লাবে কিংসফোর্ড প্রত্যহ সন্ধ্যায় হাজির হতেন তার ফিটন গাড়ী চেপে। ফিরতেন রাত আটটার দিকে। সেদিনও তিনি ক্লাবে যান। তাঁর সাথে তাঁর আরও ইউরোপীয় বন্ধু ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন প্রিঙ্গল কেনেডির স্ত্রী ও কন্যা। প্রিঙ্গল কেনেডি হলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক এবং সক্রিয় কংগ্রেস সমর্থক। সাড়ে আটটা নাগাদ প্রিঙ্গলের স্ত্রী ও কন্যা সামান্য আগেই বাড়ীর উদ্দ্যেশ্য বেরিয়ে পড়েন তাঁদের ফিটন চেপে, যেটি দেখতে কিংসফোর্ডের ফিটন গাড়ীর মতন। তাদের গাড়ীর পশ্চাতেই আসছিল কিংসফোর্ডের ফিটন গাড়ী। ক্ষুদিরাম বসু ও প্রফুল্ল চাকী জেলা জজ আদালতের কাছে হাউসের রাস্তায় উল্টোদিকে ময়দানের একটি গাছের তলায় বোমা ও পিস্তল নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। ক্লাবের দিক থেকে একটি ফিটন গাড়ীকে আসতে দেখে তাঁরা নিশ্চিত হলেন এটাই কিংসফোর্ডের গাড়ী। গাড়ীটি কাছে আসতেই বোমা ছুড়লেন দুই যুবক। যা মুহূর্তে গাড়িটিকে অত্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত করে। কোচম্যান ও সহিস আহত হলেও গাড়ীর ভিতরে বসে থাকা দুই মহিলা মারাত্মকভাবে জখম হলেন। ঘন্টা খানেকের মধ্যে প্রাণ হারান মিস কেনেডি, মিসেস কেনেডির মৃত্যু হয় ২রা মে - এর সকালে। গাড়ী দুটি প্রায় সদৃশ হওয়ায় এক ভয়ানক ভুল করে ফেললেন সদ্যযুবা দুটি। বরাতজোরে, এবারও বেচেঁ গেলেন কিংসফোর্ড এবং দুর্ঘটনার অনতিবিলম্বে তিনি অকুস্থলে পৌঁছলেন। তিনি ঘটনাটি জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশ সুপারকে জানান। এই ঘটনায় কিংসফোর্ড অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন এবং মুজাফফরপুর ত্যাগ করেন। তিনি তার পরিবারকেও মুসৌরি পাঠিয়ে দেন। ইংরেজ সরকারের তরফ থেকে স্থানে স্থানে কড়া নজরদারি বসানো হল। পুলিশ তখন দুই বাঙালি যুবকের সন্ধানে চিরুনী তল্লাশি চালাচ্ছে। এই সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ঘোষণা করলেন,এই দুই যুবকের সন্ধান দিতে পারলে নগদ পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার প্রদান করা হবে।
এই দুর্ঘটনার পর দুই যুবক তৎক্ষণাৎ সেই স্থান ত্যাগ করেন। দুই জনে নগ্নপদে ক্ষুৎকাতর অবস্থায় দুই দিকে ধাবিত হন। ক্ষুদিরাম বসু যান সমস্তিপুরের দিকে। প্রফুল্ল চাকী কোন দিকে গিয়েছিলেন আজও তা অজানা। ওয়েলি স্টেশনের কাছে দুই কনস্টবলের হাতে ধরা পড়েন ক্ষুদিরাম। তার কাছ থেকে পুলিশ দুটি রিভলভার ও কিছু কার্তুজ উদ্ধার করেন। পুলিশকর্তা আর্মস্ট্রং ক্ষুদিরামকে বন্দী করে মজঃফরপুর নিয়ে এলে সেখানে দায়রা আদালতে তাঁর ফাঁসির হুকুম দেন আদালতের অতিরিক্ত সেশন জজ কর্নডাফ। ক্ষুদিরামের ফাঁসি রদের জন্য বাংলার লে. গভর্নরের কাছে একটি "মার্সি পিটিশন" করা হয়, কিন্তু তাতে কোন কাজ হয় না। ১১ই আগস্ট ১৯০৮ সালে অগ্নিকিশোর ক্ষুদিরামের ফাঁসি হয়ে যায়। ক্ষুদিরামের ফাঁসিতে কিছু অসঙ্গতি থেকে গিয়েছিল। প্রফুল্ল চাকীর মৃত্যু পূর্বেই ঘটেছিল এবং তাঁর দেহ তিনি সনাক্তও করেছিলেন। বোমা নিক্ষেপ করাতে প্রফুল্ল চাকী অধিক পারদর্শী হওয়া সত্ত্বেও ক্ষুদিরাম বসু আদালতে দাঁড়িয়ে সব দোষ নিজের কাঁধে নেন।
বোমা নিক্ষেপের পরবর্তী ঘটনা বিভীষিকাময়। তোলপাড় করে তল্লাশি চলে বাঙালিদের ঘরে ঘরে। ক্ষুদিরাম বসু বন্দী হলেও প্রফুল্ল তখনও ফেরার। প্রফুল্ল পরের দিন মধ্যাহ্নে ত্রিগুণাচরণ ঘোষ নামে এক বাঙালির গৃহে পৌঁছন। সেখানেই স্নানাহারাদি সারেন। ত্রিগুণাচরণ ঘোষ সন্দেহ করেন যে গতকাল রাত্রের ঘটনার দুই পলাতক যুবকের মধ্যে এই যুবক একজন। তিনি প্রফুল্লকে কিছু টাকা ও নতুন জামা কাপড় দিয়ে কলকাতা চলে যেতে বলেন।
জানা যায়, এরপর প্রফুল্ল চাকী মোকামার দিকে রওনা হওয়ার উদ্দেশ্যে স্টেশনে যান। সেই দিন সিংভূমের এস.আই নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় ছুটি কাটিয়ে মোকামা ফিরছিলেন। তিনি নতুন পোশাক পরিহিত এক যুবককে দেখে তার সন্দেহ হয় এবং তিনি এগিয়ে গিয়ে সেই যুবকের সাথে পরিচয় করেন। স্টেশনে দুজনের কথায় কথায় গতকালের কথা ওঠে। গতকালের দুর্ঘটনায় দুই মহিলার গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনার শুনে প্রফুল্ল চাকী অত্যন্ত বিমর্ষ হয়ে পড়েন। তাছাড়া তাঁর কথায় পূর্ববঙ্গের টান দেখে নন্দলাল স্থির করে ফেলেন, এই সেই দুই যুবকের একজন। তিনি স্টেশন থেকে তার দাদামশাই প্রখ্যাত উকিল শিবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে দ্রুত টেলিগ্রাম করে বলেন, পুলিশ সুপারকে সমস্ত ঘটনা জানাতে এবং সেই যুবককে গ্রেফতার করার অনুমতি চাইতে। এরপর ট্রেনে উঠে তিনি প্রফুল্লর সাথে আরো ভাব জমান। পরদিন তাঁকে সিমারিয়া ঘাটে নেমে প্রাতঃরাশ খাওয়ানোর কথা বলেন। এরপর সিমারিয়া ঘাটে দুজনে প্রাতঃরাশ সেরে স্টিমারে করে মোকামা স্টেশনে আসেন। স্টেশনে এসে প্রফুল্ল চাকী কলকাতা গামী ট্রেনের টিকিট কাটেন। নন্দলাল জিআরপিতে খবর নিতে যান, টেলিগ্রামের কোন উত্তর এসেছে কিনা। তখন তিনি উত্তর পান, 'Arrest and bring the man here'.
এরপর নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায় এস .আই রামাধার শর্মা ও কনস্টেবল শিবশঙ্কর সিংকে নিয়ে যুবককে গ্রেফতার করতে ছোটেন। এই দৃশ্য দেখে প্রফুল্ল পশ্চিম দিকে ছুটতে শুরু করেন। শিবশঙ্কর তাঁকে ধরে ফেলেন এবং শর্মা তার মোটা লাঠি দিয়ে প্রফুল্লর স্কন্ধে তীব্র আঘাত করেন। এই তিনজন পরবর্তীতে বয়ান দেন যে, এরপর প্রফুল্ল পরপর দুটি গুলি করেন এবং তাই তারা এই যুবককে মেরে ফেলতে বাধ্য হন। কিন্তু উল্লেখ্য বিষয়, প্রফুল্লকে নিয়ে আলাদা তদন্ত বা বিচার কিছু হয় নি। এরপর দু দুবার প্রফুল্লর মৃতদেহের ছবি তোলা হয় এবং তাঁর মরদেহ আনা হয় ক্ষুদিরাম বসুর কাছে। ক্ষুদিরাম তাঁর দেহ সনাক্ত করে বলেন, "The body lying here is that of Dinesh Chandra Roy. I know him by general appearance not by any special marks."
কিন্তু কে এই দীনেশ চন্দ্র রায়? ক্ষুদিরাম বসু যা জানতেন,তাই জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতেও তাদের সন্দেহ প্রশমিত হল না। তাই সেই মৃত যুবকের দেহের শিরোচ্ছেদ করা হল এবং টিনের বাক্সে স্পিরিটের মধ্যে সেটা রাখা হল। সেই বিচ্ছিন্ন শির নিয়ে ডেপুটি সুপার বাচ্চু নারায়ণ লাল কলকাতায় এলেন। উদ্দেশ্য, অপরাপর বিপ্লবীদের থেকে তার পরিচয় জানা। তবে শোনা যায়, মির্জা গালিব স্ট্রিটের সংলগ্ন জৈনেক ইন্সপেক্টর পি.সি.লাহিড়ীর বাগানবাড়িতে প্রফুল্লর বিচ্ছিন্ন শির পুঁতে রাখা হয়। এই কাজটি সম্পন্ন করেন তার ভাই এস.আই হেমচন্দ্র লাহিড়ী। দেশের স্বাধীনতার পর সেই করোটিটি তুলে পরিষ্কার করে সেটি পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের হেফাজতে সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু প্রফুল্লর ধড়েরর কি হল জানা যায় না। হয়তো তা অকুস্থানে নিক্ষেপ করা হয়েছিল শৃগাল - সারমেয়দের উদরপূর্তির জন্য। না জেল, না দ্বীপান্তর , না ফাঁসি - এক বীর বিপ্লবীর মৃত্যু হল চরম অসম্মানিত অবস্থায়। তবে গ্রন্থকার জানাচ্ছেন, ফরেনসিক পরীক্ষার পর জানা যায়, সংরক্ষিত করোটি টি কোন পঁয়ত্রিশোর্ধ মহিলার।
প্রফুল্লর মৃত্যুর পর তাঁর কর্তিত শিরের ফটো গেল তাঁর বগুড়ার বাড়িতে। তাঁর দুই বড় ভাই তাঁকে শনাক্ত করেন। তাঁর মাতা তখন জীবিতা। প্রফুল্লর মাতা তাঁর কর্তিত মস্তকের ফটো দেখে বলেন, " এ আমারই ছেলে প্রফুল্ল। আজ আমি ধন্য।"
উল্লেখ্য ,তাঁর মরদেহের কোন অংশ তারা পান নি। কিন্তু তারা শ্রাদ্ধের ব্যবস্থা করলেন। তাঁর শ্রাদ্ধে তাঁকে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনে সবচেয়ে বেশি উৎসাহী ছিলেন তাঁর মা। নিয়মানুষ্ঠান করার জন্য তাঁরা পণ্ডিতমন্ডলীর পরামর্শ নিলেন। স্থির হল, করতোয়া নদীর তীরে প্রফুল্লর কুশপূত্তলিকা দাহ করে অন্তেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। শাস্ত্রবিহিত শ্রাদ্ধের দিনে মাতা স্বর্ণময়ী সর্বক্ষণ শ্রাদ্ধ বাসরে উপস্থিত থেকে তার বীর পুত্রকে সম্মান জানালেন।
তাঁর আবক্ষ ও পূর্নাবয়ব মূর্তি নির্মিত, হয়েছে কিছু স্থানে। তবু তাঁকে কি আমরা যথার্থ সম্মান দিতে পেরেছি ! অধিকাংশ ভারতবাসী এই শহীদের নাম শোনেনই নি। আজ স্বাধীনতা দিবসে তাঁর আত্মবলিদানকে স্মরণ করে তাঁর প্রতি রইলো অশেষ বিনম্র শ্রদ্ধা।
" আজি তোমারে ভুলিতে পারিনি
বীর প্রফুল্ল চাকী।
তব পবিত্র সুকঠোর দেহ
স্পর্শিতে কভু পারে নাই কেহ
নিজ হাতে দিলে পরাণ আহুতি
বন্ধন লাজ ঢাকি।
( রচনাকার - অজ্ঞাত)।
সমগ্র স্বাধীনতা আন্দোলনে নন্দলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত কাল্প্রিটরা ব্রিটিশদের হয়ে চটি চেটে গেছেন। শুধুমাত্র নিজের পরিবারের কথা ভেবে রায়বাহাদুর খেতাব নিয়েছেন, অর্থ উপার্জন করেছেন। আর ইতিহাসের পাতায় মীরজাফর চরিত্রটি কলঙ্কিত নায়ক হিসাবে সবার মুখে মুখে ঘুরতে শুরু করলো। হাজার হাজার মীরজাফরদের কারণেই এই ভারতবর্ষকে বহিরাগতা থেকে ব্রিটিশরা শুধু শাসন ও শোষণ করে গেল। আর একশ্রেণীর নিঃস্বার্থ দেশপ্রেমিকরা নিজেদের জীবনের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য আনন্দ বিসর্জন দিয়ে জীবন বলিদান দিল। অথচ সেই সমস্ত বিপ্লবীরা রয়ে গেল ইতিহাসের পাতার অন্তরালে। তাই আমাদের আরো সচেতন হতে হবে। ইতিহাস পরবর্তী প্রজন্মের সামনে তুলে ধরতে হবে। বিপ্লবীদের আত্ম আত্ম কাহিনী কে সম্মান জানানোর দায়িত্ব এখন বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে। মনে রাখবেন ইতিহাস স্বার্থপরদের ক্ষমা করবে না তবে সময়ের অপেক্ষাতেই আমাদের থাকতে হবে। বিপ্লবীদের আত্ম বলিদানের ইতিহাস যদি আমরা অনুধাবন ও উপলব্ধি না করতে পারি তাহলে আগামী ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্ম আবার কারো না কারো গোলামী করবে এটা মেনে নিতে পারবেন তো? বাঙালি আজ নিজেদের ইতিহাস সাহিত্য সংস্কৃতি ভুলতে বসেছে। যে বাঙালি একসময় শিল্প ও সাহিত্য সংস্কৃতিতে সমগ্র ভারতবর্ষে পহেলা নম্বরে ছিল সেই বাঙালি এখন নিজেদের ভিক্ষুকে পরিণত করেছে। শপথ নিন আজ থেকে যে আপনার পরবর্তী প্রজন্ম যেন এই ভিক্ষাবৃত্তি কে উপেক্ষা করে নিজেদেরকে ভারতবর্ষের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রমাণ করতে পারে। শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রজন্মের। সেই সঙ্গে বাঙালিকে প্রমাণ করতে হবে যে তারা মীরজাফর কিংবা বিশ্বাসঘাতক জাত নয়।
তথ্য সূত্র :
(১) বঙ্গে অগ্নিযুগ, সাংস্কৃতিক সময় - নির্মল নাগ
(২) ক্ষুদিরাম ও প্রফুল্ল চাকী - চিন্ময় চৌধুরী।

