ট্রাম্প মোদিজির বন্ধু । সেই বন্ধুর অনুরোধে যুদ্ধবিরতি সম্ভব হয়েছে বলে বন্ধুরই দাবি । এই দাবি নিয়ে এ দেশে তর্কের আবহাওয়া তৈরি । কিন্তু বারেবারে বন্ধুর দাবি সেই তর্কে অন্যমাত্রা যোগ হতে পারে । যাই হোক । তবে বাণিজ্য স্বার্থে যুদ্ধবিরতি বলে বন্ধুর কথাটা উড়িয়ে দেওয়া যায় না । বন্ধু বাণিজ্য ছাড়া আর কিছু বোঝে না । বন্ধু যখন আমেরিকার পঁয়তাল্লিশ তম প্রেসিডেন্ট ছিলেন তখন আমেরিকার সাথে ভারতের ব্যবসায়িক সম্পর্কে ভারতের থেকে আমেরিকার লাভ সবসময়ই বেশি থাকে । ট্রাম্পের আমলে আমেরিকায় ভারতের রফতানি বেড়েছিল ২২%, আর ২৯% বেশি আমদানি করতে হয়েছিল । আমদানির ক্ষেত্রে সামরিক খাতের প্রাধান্য ছিল বেশি । ড্রোন থেকে নানা ধরনের হেলিকপ্টার যা কেবল সামরিক প্রয়োজনে ব্যবহারযোগ্য । ট্রাম্পের আমলে আমেরিকার বাজারে ভারত এই খাতে প্রায় ৪.৪ বিলিয়ন ডলার খরচ করেছে । সামরিকভাবে দেশকে ক্ষমতাশালী করতে বন্ধুর প্রয়োজন নাকি বন্ধুর দেশের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করার প্রয়োজনে সামরিক সজ্জা বিক্রি করা -- এই প্রশ্নে বন্ধুর ব্যবসায়িক স্বার্থেরই পরিচয় ফুটে ওঠে, তাতে কিন্তু এ দেশের মানুষের জীবনধারণের ক্ষমতা বাড়ে না । এবার ব্যবসার শুল্ক নিয়ে কথা হলেও এখনও বিষয়টি পরিষ্কার হয়নি ।
তাহলে বন্ধু ট্রাম্প এখন মানবদরদী হয়ে ওঠার জন্যে যুদ্ধবিরতি চায়নি । মানবদরদী হয়ে ওঠার জন্য গাজায় মানুষের অসহায় অবস্থার জন্য উদ্বিগ্ন । আবার ইজরায়েলকে যুদ্ধ করার জন্য সমর্থন । এদিকে যে তুরস্ক ভারতের সাথে যুদ্ধে পাকিস্তানের সবরকম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, সেই তুরস্ককে ২২৫ মিলিয়ন ডলারের অস্ত্র বিক্রি যুদ্ধ শেষ হতে না হতে । মানবদরদী কথা বলা আর কাজ তার উল্টো । বন্ধুর দ্বিচারিতা স্পষ্ট। শুধু তাই নয় ট্রাম্পের বিগত আমল একটু দেখে নিলোই বোঝা যায় তাঁর আসল চরিত্র ।
বর্ণবিদ্বেষ আমেরিকার একটি জটিল রোগ । ট্রাম্পের আমলে সেই রোগ আবার নতুন করে তখন মাথাচাড়া দিয়েছিল ।
বিগত শাসনকালে ট্রাম্প মুসলিম দেশের নাগরিকদের আমেরিকা ভ্রমন নিষিদ্ধ করেছিলেন । শরণার্থীর অনুপ্রবেশ বন্ধ করার জন্য মেক্সিকো বর্ডারে প্রাচীর তুলেছিলেন যা ট্রাম্পের প্রাচীর নামে খ্যাত । এমনকি শরণার্থী শিবিরে পরিবার পৃথকীকরণের নামে অভিভাবকদের কাছ থেকে শিশুদের আলাদা করে রাখার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন । সেই ব্যবস্থা শিশুদের জন্য একেবারেই স্বাস্থ্যকর ও সুস্থ পরিবেশ ছিল না বলে অভিযোগ ছিল । এমনকি শিশুদের কান্না থামিয়ে রাখার জন্য ইঞ্জেকশন দিয়ে ওষুধ প্রয়োগ করা হত যা শিশুদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যকে বিঘ্নিত করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছিলেন। যে প্রশাসন মানুষকে প্রকাশ্যে খুন করতে পারে, সেই প্রশাসন শিশুদের প্রতি অমানবিক হবে, এতে আর নতুন করে আশ্চর্যের কিছু নেই।
বর্ণবিদ্বেষ, মুসলিম বিদ্বেষ, শিশু বিদ্বেষকারী এই ট্রাম্পের বন্ধু মোদিজি । বাংলায় একটা কথা আছে, সেয়ানে সেয়ানে কোলাকুলি । কিংবা সৎসঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে নরকবাস । এই সঙ্গ নিয়ে তাঁদের বন্ধুত্ব কোন পথে তা পাঠক নিশ্চয় বুঝতে পারবেন । তবে করোনাকালে দুই বন্ধুর সরকার দেখিয়ে দিয়েছে, সাধারণ মানুষ কত অসহায় হয়েছিল । উন্নত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা ও উন্নয়নশীল দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার মধ্যে কোন পার্থক্য দেখা যায়নি সেদিন । উন্নত ও উন্নয়ন শব্দের চেহারায় স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্র লুকিয়ে যে ছিল তা দেখিয়ে দিয়েছে কোভিড-১৯ । দুই বন্ধু সেদিনও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার করুণ চিত্রে তথ্যের ষড়যন্ত্র তৈরি করেছিল । ষড়যন্ত্র তত্ত্ব ও বিভ্রান্তিকর মন্তব্যে ট্রাম্প আমেরিকার ইতিহাস তৈরি করেছিল । এমনকি তাঁর বিরুদ্ধে চৌত্রিশটি জালিয়াতির অভিযোগ দায়ের হয়েছিল । পরিশেষে আদালতে আত্মসমর্পণ করতে হয়েছে তাঁকে । ইতিহাসবিদ ও পন্ডিতদের মতে পঁয়তাল্লিশ তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনিই আমেরিকার ইতিহাসে সবথেকে নিম্নমানের প্রেসিডেন্ট। বিদ্দজনের কাছে একজন নিম্নমানের প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিবেচিত হলেও তিনি পুনরায় ক্ষমতা দখল করেছেন । এখন তিনি মানবদরদী রূপে অবতীর্ণ হতে চাইছেন ।
আসলে বন্ধু ট্রাম্পের মানবদরদী রূপ তাঁর বিশেষ ট্রাম্প কার্ড ছাড়া আর কিছু নয় ।

